নদী ও লাশের বিভ্রম
বর্ষার মাতাল স্রোত। নৌকা সারিয়ে নেয় ছকু মাঝি। নিজের সামান্য পৈতৃক জমির প্রায় সবটুকু নদীবক্ষে।পিচাশিনী নদীটি জন্মের ক্ষুধা মেটাতে গোগ্রাসে গিলে পাড়া,জনপদ। দু'পাশে বাধ দিয়ে শাসন করলেও প্রতিশোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভূমিদস্যুর মতো।সীমানা বাড়াতে যতটা পারে নিজের ভিতর লুটে নেয়।সেই বিশাল নদীর উন্মাদ স্রোতে ছকু মাঝি নৌকা লম্বা বাঁশ দিয়ে ঠেলে পার করে, দু টাকা ভাড়ায়। উপচে পড়া ভিড়! গোধূলিলগ্নে জলের গর্জন বুকের ভিতরটা শুকিয়ে দেয়। তবু জীবনের তাগিদে দুপাড়ের মানুষের পারাপার চলে নিত্য। নদীটিকে নিয়ে বহু মিথ আছে। নৌকা চালানোর সময় হঠাৎ মাঝনদীতে জলের ঘূর্ণনে ভারসাম্য হারানো টলমল,ডুবুডুবু নৌকার যাত্রীরা মৃত্যুর আশঙ্কায় ভাবে-নদী মানুষ খাবে। স্বেচ্ছা আত্মাহুতি দেবার কেউ থাকে না, কিংবা সাঁতার জানা কাউকে নদী ভক্ষণে বিঘ্ন ঘটবে বলে এ সময় শিকার হয় ছোট শিশুরা। শোনা গেছে মায়ের বুক থেকে জোর করে শিশুকে জলে নিক্ষেপ করা হয়। আবার রুষ্ট নদীটি নৌকা ডুবিয়ে দিয়েও একসাথে বহু ভক্ষণ করে..।সব বিপদ মাথায় নিয়ে ছকু মাঝি চলে।পথ নেই, উপায় নেই..। বাসায় অবুঝ ছেলে-মেয়ে। ক্ষুধা আর দারিদ্রের সাথে লড়ে।
বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে ছকু মাঝি বাড়ি ফেরে । একদিন নদীতে এক যুবতীর লাশ ভেসে যাওয়া দেখে।কি বেদনা বুকে একটি মৃত শরীর ভেসে যায়,ছকু মাঝি বুঝতে পারে না। কতদূরে গিয়ে লাশটা থামবে? স্রোতস্বিনীর বুকে ভেসে সে কোন অমরাবতীতে পৌঁছবে?কত পথ,কত কাল ধরে চলবে? পার্থিব কষ্টের কি মুক্তি মিলবে?
ছকু মাঝি ভাবনায় এলোমেলো হয়। দেখে নদীপথে ভেসে আসে আরো লাশ..অজস্র লাশ..ঘোরাচ্ছন্ন ছকু মাঝি নদীর ওপারে পৌঁছে হাঁপাতে থাকে। পানি খেতে যায়, কিন্তু জলের ভিতর লাশের ছবি দেখে।অচেতন হয়ে পড়ে যায়। কতক্ষণ থাকে জানে না। স্থানীয় মানুষেরা জ্ঞান ফিরাতে সাহায্য করে।ছকু মাঝি কিছুটা ভালো অনুভব করে।বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে। ওপারে যেতে চাইলে দেখে কয়েকজন মানুষ একটি লাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।পার হতে না পারলে দাফনে বিলম্ব হবে। বেশি ভাড়া দিতে চাইলে এবং লাশটি নিজ গ্রামের হওয়াই সে রাজি হয়। সন্ধ্যার আঁধার কেটে আকাশে সাদা চাঁদ,মৃতের মুখের মতো। নদীর জলে ঝলমলে আলো। স্রোত আর আলোর খেলায় ভয়ঙ্করী হয়ে উঠে নদীটি। ঠিক যেখানে যুবতীর লাশ ভাসে সেখানে ছকু মাঝি থমকে চায়, কেঁপে উঠে।না ,জলে কোথাও লাশ নেই।নৌকায় লাশের দিকে তাকায়। একি!এ যে সেই যুবতীর মুখ.. ফর্সা..চোখ খোলা.. এখানে কেন?সে তো জলে ভেসে গেছে অন্য পৃথিবীর টানে..ছকু মাঝি ভাবতে পারে না। ভালো করে সাহস নিয়ে আর একবার তাকায়.. দেখে যুবতীর লাশের পাশে অনেক লাশ..কেউ জীবিত না.. নৌকা ভরা লাশ.ছকু মাঝি কাউকে কাউকে চিনতে পারে..তার ফুফু অনেক আগে স্বামীর হাতে খুন হয়েছে..আরও একজন যে কিনা তাকে ভালোবেসে গলায় দড়ি দিয়েছে..ছকু মাঝি চিৎকার করে মূর্ছা যায়..
তারপর জল আর নদীর মিতালী থেকে বিচ্ছিন্ন ছকু মাঝি আর কথা বলে নি কোনোদিন..। সময়গর্ভে নদী হারিয়েছে স্রোত, ক্ষিপ্রতা। মানুষের শাসনে ভদ্র নদীটি ক্রমশ ছোট থেকে ছোট হয়েছে কিন্তু নির্বাক ছকু মাঝির জীবনের গল্পটা দীর্ঘ হতে থাকে।সরু ক্ষীণতোয়া নদীটির জলের দিকে তাকিয়ে আজো যুবতীর লাশ দেখে.. ।দেখে মৃত নারী শরীর..। বহুযুগের বেদনা নিয়ে অকালমৃতা নারীর অদৃশ্য লাশের দিকে স্তব্ধ নীরবতায় ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকে ছকু মাঝি আজো....। নদী ও লাশের বিভ্রমে....