বিশ্বকাপের রঙনামচা
রাজপথের বাইরে একটা সরু ফিটফাট রাস্তার ত্রিমাথায় বহু মানুষের ভিড়। এখানে কারণে অকারণে আড্ডা তর্কে মুখর থাকে সবসময়।ত্রিমাথার পাশে দুটি দোকানের মাঝে প্রশস্ত ফাঁকা স্থানে বিশাল পর্দা টাঙানো ,ধবধবে সাদা। কাফনের মতো শুভ্র,স্নিগ্ধ।আজ রাত গভীরে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। সেমিফাইনাল রাউন্ড। আর্জেন্টিনা ভার্সেস ইংল্যান্ড।ত্রিমাথার আশেপাশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উপভোগ করবে সেরা দলের সেরা পারফর্মেন্স।দুটি মহাদেশের দুটি দেশকে এই বিশ্বকাপ এক করেছে। ঘটিয়েছে মেলবন্ধন। খেলোয়াড়দের শৈল্পিক দক্ষ নিপুণতা মন কাড়ে কোটি কোটি মানুষের।লিপইয়ারের মতো চতুর্বর্ষী এই বিশ্বকাপ ফুটবল আমেজ,আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব আর বিশ্বমিলনের বার্তা নিয়ে আসে।বিশ্বব্যাপৃত এই আয়োজন সীমানা ডিঙিয়ে প্রতিটি দেশে পৌঁছে দেয় উষ্ণতা, হৃদ্যতা আর ভালবাসা।আর এটি বাঙালি আবেগকে জাগ্রত করে, পাগল করে আরো বেশি।
তাই আবেগী হুজুকপ্রিয় সরল হৃদয়বান বাঙালি বিশ্বফুটবলে শৈলি প্রদর্শন করতে না পারলেও ভিনদেশী খেলোয়াড়দের কলা প্রদর্শনের সবটুকু মুগ্ধতা শুষে নেয়, চেটে নেয়।ত্রিমাথায় রঙিন চায়ে চুমুক দিয়ে মানুষ অকারণ কারণ খোঁজে, খোঁজে নিজেদের পালানো ইতিহাস। বহিরাগতদের অজানা অতীত আর না দেখা ভবিষ্যত।খুঁজে না পেলে নিজেরাই ভিন্ন মানুষের ভিন্ন জীবনী লেখে।এই নানাবর্ণী গল্পের আজ কেন্দ্র বিশ্বকাপ।বৃহৎ দুটি দলের সমর্থক এ দেশে দৃশ্যমান। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল! অন্যান্য দলের সমর্থকদের উপস্থিতি গৌণ।ব্রাজিল কোয়ার্টারের আগে আউট হলেও তাদের দুঃখ লাঘব হবে আর্জেন্টিনার সেমি ফাইনালে পরাজয়ে!এই তিথি প্রচণ্ড আনন্দ জাগানিয়া! পছন্দের দলের বিজয়ে আনন্দ মিছিলে অংশ নেয় ,আবার অপছন্দের দলের পরাজয়ে সুখের উল্লাসে মাতে। বাজি-পটকায় বাংলার আকাশ ঝাঁজরা করে, প্রজ্জ্বলিত ফানুসে ছড়িয়ে দেয় প্রেমের উত্তাপ।
সমবেতের মধ্যে একদল ব্রাজিলিয়ানের অকপট মন্তব্য আজ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা নির্ঘাত হারবে।আমরা খাসি উৎসব করবো। ধবধবে ফর্সা বলিষ্ঠ খাসি! মেসির মতো বয়স্ক! প্রিয় তারকাকে নিয়ে এমন মশকরা কোনো ভাবেই বরদাস্ত নেহি।কাভি নেহি। একজন উন্মাদ আর্জেন্টিয়ান সজোরে এক ঘুসি লাগায় ব্রাজিলিয়ানের মুখে ,আর বুক চাপড়ে চিৎকার করে ফাইনাল জিতে আমরা গরু উৎসব করবো! ব্রাজিলের মাঠের গরুদের চেয়ে শক্তিশালী!এবার বাকযুদ্ধের সাথে হস্তশৈলির এগজিবিশন! জোড়া জোড়া!দলবদ্ধ! সম্মিলিত!
হঠাৎ আর্তচিৎকার! এগজিবিশন দর্শকদের ! মরে গেছে! মরে গেছে!থামো! থামো! হতভম্ব যোদ্ধারা! একটি প্রাণহীন দেহ! জিভে নিজের দাঁতের মরণ কামড়!বিস্ফোরিত দৃষ্টি মেলে! দীঘল কপোল বেয়ে দ্রাঘিমার মতো রক্তাশ্রুর দাগ! মানুষের নিষ্ঠুরতায় অসীম পলকহীন চেয়ে। নির্মম বেদনার সাক্ষী সেই অসীমের অধীশ্বরের পায়ে পার্থিব দুঃখ জমা রেখে তার দর্শনের অপেক্ষায়। দুফোঁটা অশ্রুচিহ্ণ শুধু তাকেই নিবেদন।
ভিড় বাড়তে থাকে। জটলার মাঝে একটি মিনি ট্রাক। কয়েকটি গরু!জিহ্ব বেরিয়ে।মুখ দিয়ে ফেনা পড়ছে। গরমের তীব্রতায় বুক শুকিয়ে খাঁক।দড়ির বজ্র আটুনিতে বেসামাল দাঁড়িয়ে!ট্রাকের মেঝেতে গলায় ফাঁস আটকে পড়ে থাকা নির্মম লড়াইয়ে হেরে যাওয়া মৃত গরু। জন্মভাগ্যের কষ্টে এ যেন স্বেচ্ছা আত্মহনন! নির্লিপ্ত, স্বাভাবিক স্বীকারোক্তি ড্রাইভার এবং সঙ্গীর! এগুলো কসাইয়ের গরু! অদূরে যাবো! মানুষ না!কসাই! কসাই! মৃদু অনুরণন উঠে!
ঠিক তখনি একটা অলক্ষ্য কণ্ঠ ধ্বনিত হয়।আজ সেমি জিতে আর্জেন্টিনার ভোজ হবে মরা গরুর ভোজ!ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আর্জেন্টাইন অলক্ষ্য কণ্ঠপথে!