শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা কেন জরুরি

About Kids and Cultural Activities.

Jun 12, 2026 - 12:20
Jun 12, 2026 - 09:31
 0  16
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা কেন জরুরি
শিশুরা খাওয়া ও হাঁটতে শিখলে বাবা মা ভাবেন-আমার সন্তানটি মানুষ হবে কীভাবে। মানুষ হওয়া মানে একজন দায়িত্বশীল ও সমস্ত মানবিক গুণ নিয়ে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠা। মানবিক গুণগুলো কী? মানবিক গুণ হলো মানুষের সাথে ভালো আচরণ,সত্য কথা বলা,সমস্ত জীবের প্রতি ভালোবাসা,সহমর্মিতা,দয়া,সততা,অন্যের উপকার করা,বড়দের,শিক্ষকদের শ্রদ্ধা,সম্মান করা, তাদের উপদেশ, শিক্ষা মেনে চলা, ছোটদের ¯েœহ করা,মানুষের উপকার,বন্ধুত্ব,অসহায়,গরীব মানুষের পাশে দাঁড়ানো,উদারতা,সহযোগিতা, সেবা,ন্যায় বিচার, নেতৃত্ব প্রদান,অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ইত্যাদি। এসব গুণাবলী অর্জন কীভাবে সম্ভব? এজন্য প্রয়োজন নিয়মিত চর্চার।
চর্চা হলো অনুশীলন অর্থাৎ বারবার একটি কাজ করে তা আয়ত্বে আনা। চর্চা না হলে মানষের এসব মানবিক গুণাবলী বিকশিত হয় না। যেমন ধরা যাক- মানুষের সাথে সুন্দর করে কথা বলা,তার সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া। এসব কীভাবে করতে হয়,তা যদি শিশুরা না জানে,না শেখে,তাহলে মানুষ তো তাদেরকে অভদ্র,অমানুষ বলবে। এজন্যই চর্চার প্রয়োজন। মূলত এই চর্চাটি হয় পরিবারে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কিছু বেসরকারি সংগঠনেও এই চর্চার সুযোগ আছে। সে কথায় আসছি পরে। 
তার আগে চর্চা কথাটি আরো ভালো করে বুঝে নেওয়া যাক। আমরা স্বর্ণ বা সোনার কথা জানি।.স্বর্ণখনিতে সোনা হলুদ বর্ণের পাথরের আকারে থাকে। এটাকে তখন দেখলে মনে হবে এক খ- সাধারণ পাথর;সোনা একেবারেই মনে হবে না। খনি শ্রমিকরা ড্রিলিং ও ব্লাস্টিং এর মাধ্যমে এই পাথরকে ভেঙে,বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে  সেই পাথর থেকে উজ্জ¦ল রঙের সোনার পি- বের করে আনে। সেই পি- থেকে তৈরি হয় বিভিন্ন গহনা,যা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষের মানবিক গুণগুলোও এ ধরনের আবরণে ঢাকা স্বর্ণের মতো। সেই স্বর্ণে জড়ানো হলুদ আবরণ ভেঙে চকচকে স্বর্ণের উজ্জ্বলতায় ফিরিয়ে আনার নামই চর্চা। 
স্কুল কলেজে যেসব বই পড়া বা পড়ানো হয়, সেখানে মানবিক গুণে গুণান্বিত হওয়ার অনেক উপকরণ বা অধ্যায় রয়েছে। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি সেইসব উপকরণ বা অধ্যায় পাঠের সঙ্গে আরো যেসব শিক্ষা অর্জনের প্রয়োজন, সেগুলোর যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়।। সেইসব ঘাটতির মধ্যে বিশেষ করে রয়েছে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার অভাব। এটাকে আমরা সহশিক্ষা বলতে পারি। এই সহশিক্ষা হতে পারে দুইভাবেঃ ১.সাহিত্য চর্চা ও ২. সংস্কৃতি চর্চা
আসা যাক সাহিত্য চর্চার কথায়।  আমরা সবাই জানি সাহিত্য আমাদের সুন্দর সুন্দর বিষয়ে চিন্তা করতে শেখায়। মাথা থেকে খারাপ চিন্তাগুলোকে সরিয়ে দেয়। সাহিত্যের বিভিন্ন কবিতা,গল্প আমাদের হৃদয়কে ফুলের মতো করে মেলে ধরে। এই  পরিস্ফুটিত হৃদয়ই পারে মানুষকে ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করতে। পারে মানুষকে সেবা করার মানসিকতা তৈরি করতে। পারে দেশ ও সমাজে সুন্দর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। 
সাহিত্য চর্চার মধ্যে রয়েছে বই পড়া। এজন্য প্রয়োজন পাঠ্যবইএর বাইরের বই পড়া।  আমাদের স্কুল কলেজ জীবনে প্রতি সপ্তাহে লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়ে আবার পরের সপ্তাহে তা ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। যতদূর জানি,এখন স্কুল কলেজে লাইব্রেরি থাকলেও বই পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই। পাঠ্যবই এর বাইরেও যে জানা ও বোঝার বিশাল একটা জগত রয়েছে, তা শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই এর বাইরের বই না পড়ার কারণে জানার সুযোগই পায় না। তাই শিশু-কিশোরদের জ্ঞান হয়ে পড়ছে সীমিত কিছু ধারণায় সীমাবদ্ধ। আজকের বিশ্বের আধুনিক জ্ঞান ভা-ারের সাথে যুক্ত হতে না পারলে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায় নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করতে পারবে না। সমাজে একটা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে না পারলে তারা নিজেদের যেমন সততার সাথে উন্নত করতে পারবে না,তেমনি মানুষের জন্য,সমাজের জন্য কিছু করতেও পারবে না। বই পড়ার অভ্যেসের কারণে শিক্ষার্থীদের বানান ভুল ,বাক্য গঠনের ভুল দূর হবে,শব্দ ভা-ার বাড়বে,ভাষাজ্ঞান বাড়বে, যা তাদের ক্লাসের পড়াশোনা বিশুদ্ধ করতেও সাহায্য করবে। শুধু তাই নয়,গল্প কবিতা পড়তে পড়তে তাদেরও গল্প কবিতা লেখার আগ্রহ তৈরি করবে। সেই লেখা যদি তাদের নেশার মতো হয়ে যায়,লিখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে তাদের মধ্য থেকেই তৈরি হবে দেশ বরেণ্য কবি,গল্পকার বা প্রাবন্ধিক। 
এবার সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। সংস্কৃতি চর্চা,যেমন সঙ্গীত,নাচ,নাটক,উপস্থাপনা,বিতর্ক,আবৃত্তি,বিভিন্ন খেলাধৃুলা এসবেরও প্রয়োজন রয়েছে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য। প্রতিটি শিশু কিশোরের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সৃষ্টির অনন্য প্রতিভা। সঙ্গীত,বিতর্ক,অভিনয়,আবৃত্তি,উপস্থাপনা করলে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের সুন্দর করে কথা বলার অভ্যাস তৈরি হয়। মানুষের সাথে কথা বলতে জড়তা কেটে যায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সাহসী হয়ে ওঠে। মানুষকে সম্মান করতে শেখে। ভালোবাসতে শেখে। সবাই তখন সংস্কৃতিসেবীদের  চিনবে,সম্মান করবে,এমনকি তাদের যে কোন প্রয়োজনে মানুষ সহযোগিতার হাতও বাড়িয়ে দেবে। আজকের সমাজে যার যত বেশি পরিচিতি,যত বেশি ভালো সম্পর্ক,তার উন্নতি,সাফল্য ও সম্মানও তত বেশি। যেমন,এই বগুড়ারই কৃতি সন্তান কথা সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস,সেলিনা হোসেন,রোমেনা আফাজ,ক্রিকেটর মুশফিকুর রহিম প্রমুখ। চেষ্টা করলে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও পারবে পড়াশোনার সাথে সাথে এ ধরনের খ্যাতি অর্জন করতে।  এটা অসম্ভব কিছু না। 
তবে এটা ঠিক যে-এসব শেখার জন্য পরিবার,স্কুলের পাশাপাশি আলাদা প্রতিষ্ঠানও দরকার। আগেই বলেছি- স্কুল কলেজে এই সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য যে সহশিক্ষার প্রয়োজন,প্রতিটা বিষয়ে আলাদা আলাদা টিচারের প্রয়োজন ,তা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই বললেই চলে। বই কিনে যেমন বাড়িতে বসে একা একা কিছু শেখা যায় না,স্কুল কলেজে ভর্তি হতে হয়, তেমনি ছড়া কবিতা গল্প কীভাবে লিখতে হয়,কীভাবে আবৃত্তি,বিতর্ক,অভিনয়,ছবি আঁকা,অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে হয়,সেসবও বাড়িতে একা একা শেখা যায় না,একটা প্রতিষ্ঠানের দরকার হয়।
আমরা জানি আমাদের স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীরা  পড়াশোনার অস্বাভাবিক চাপে নিজেদের আলাদা করে ভাবার কোন সুযোগই পায় না। এক কোচিং থেকে ছুটে যেতে হয় আরেক কোচিংয়ে। আমরা জানি এই চাপের মাধ্যমে তাদের সুন্দর আনন্দময় শৈশব কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমরা খুব কষ্টের সাথে অনুভব করি-শিশু-কিশোররা সুন্দর বিকেলে খেলাধুলার কোন সুযোগ পায় না। খেলাধুলার মাঠও তেমন নেই। মেয়েরা যে নিজের বাড়ির উঠোনে একটু এক্কাদোক্কা,ছি বুড়ি খেলবে সেই সুযোগও কিশোরী মেয়েদের নেই। এরমধ্যেই যেটুকু সময় তারা পায়, সেই সময়টুকুতে তারা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে গেমস খেলে বা অন্য কিছু দেখে একটু আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করে। আমরা মোবাইল দেখতে নিষেধ করতে চাই না। তবে সেই দেখাটা তারা একটু কমাতে পারে নিশ্চয়ই। সেই স্বল্প অবসরে একটু গল্পের বই পড়ার চেষ্টা করতে পারে। ভালো লাগলে একটা ছড়া,কিংবা কোন গল্প,কোন ভ্রমণ কাহিনি লেখারও চেষ্টা করতে পারে। অবশ্যই পারে। হয়্যার দেয়ার ইজ এ উইল, দেয়ার ইজ এ ওয়ে। এই কাজে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে ও সহযোগিতা করতে একদিকে আছে যেমন শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমির স্থানীয় শাখা,তেমনি বেসরকারি পর্যায়ে রয়েছে কুঁড়ি,উচ্চারণ একাডেমি,প্রকাশ শৈলির মতো শিশু-কিশোর সংগঠন। প্রাতিষ্ঠানিক  পড়াশোনা ও কোচিংয়ে যাওয়ার ব্যস্ততার মধ্যেই একটু সময় বের করে নিয়ে এসব সাহিত্য- সংস্কৃতি চর্চার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যুক্ত হতে পারলে শিক্ষার্থীরা তাদের মানবিক গুণ অর্জনই শুধু নয়,সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের প্রয়োজনীয় সুযোগটুকুও পেতে পারে। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের সহযোগিতা ও প্রেরণাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষায় বেশি নম্বর প্রাপ্তির বিষয়টি মাথায় রেখেও শিক্ষার্থীদের মানবিক মানুষ  ও আগামীর আত্মবিশ্বাসী ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার জন্য অভিভাবক,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থী-এই তিনটি পক্ষের সম্মিলিত প্রয়াস খুব জরুরি আজ।  -লেখক: অভিভাবক,কবি,কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট 

রাহমান ওয়াহিদ a Retire Govt Employee, A writer and a poet. নামঃ রাহমান ওয়াহিদ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা,কবি,কথাশিল্পী ও কলামিস্ট।