পূতচিহ্ণ
ঐতিহাসিক পাহাড়পুর প্রাচীন ইতিহাস কিংবা ইতিহাসপূর্ব এক শাসনামলই নয়,নয় ঋদ্ধ এক প্রত্নযুগ। পর্যটক কিংবা দর্শনার্থীদের বিনোদন আর অবাক রহস্যের আড়ালে এর প্রতিটি ইট যেমন প্রত্ন ইতিহাসের সাক্ষী,তেমনি এর মাটিতেও একাত্তরের অমোচনীয় রক্তের দাগ লেগে ।
সারা বাংলাদেশ যখন দখলদারের হাতে জিম্মি তখন এই পুণ্য তীর্থস্থানটি,এই বৃহৎ শিক্ষালয়টিও গোর্বিত আত্মপরিচয়ের দায়ে বন্দি।পাহাড়পুরে পাকিস্তানি দোসররা ক্যাম্প গড়েছে মুক্তি সহ জননিধন ধ্বংসযজ্ঞের উদ্দেশ্যে।
যে ক্যাম্প বেদনার,যে ক্যাম্প বাঙালি অস্তিত্ব বিলীনের,যে ক্যাম্প চরম ঘৃণার। সেই ক্যাম্প নিশ্চিহ্ন করতে হবে। দেশকে বাঁচাতে হবে।মুক্তিবাহিনীরা এ খবর জানতে পেরে একদিন অকস্মাৎ আক্রমণ করে।ক্যাম্পকে উড়িয়ে দেবার জন্য বীরের মতো ফায়ার করতে করতে সামনে এগিয়ে যায়।সেদিন গুলির শব্দে চারপাশ ভারি হয়।টার্গেট যখন শতভাগ সফল তখন কৌশলী পাকিস্তানিরা হলুদ খেতের লাইন ধরে পাতার আড়ালে চুপি চুপি পেছন থেকে ঘিরে ফেলে। বাংলাদেশ যে তাদের চাই!এমন স্বপ্নময় সবুজ একটুকরো স্বর্গের লোভে পশুদের জিহ্বায় বহু যুগের লালা।তখন হঠাৎ এমন অভিঘাতে উদ্ভ্রান্ত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুক্তিদের কিছুই করার থাকে না। ভয়ঙ্কর নির্যাতনের ভয়ে কেউ কেউ নিজের হাতের গ্রেনেড দিয়ে আত্মহত্যা করে ।পশুদের হাতে ধরা পড়ে অন্যরা অকরুণ নৃশংসতার শিকার হয়!শহীদ হয়!পূতস্থানে পূতরক্তে নিভৃতে বড় হয় যুগের টেরাকোটা !
সেদিনের অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলো আক্কেলপুরের একজন টগবগে তরুণ যোদ্ধা। সুদর্শন , সাহসী, নির্ভীক সেই যোদ্ধার প্রতি পাকিস্তানিদের সব আক্রোশ গিয়ে পড়ে।তারা তাকে ধরে নিয়ে সেনা-গাড়িতে করে জয়পুরহাট শহরে ঘুরে বেড়ায় আর বিকৃত উল্লাসে মাতে। 'মুক্তি ধরা পড়েছে' এমন উচ্ছ্বাসে পুরো শহর থমথম করে।আতঙ্ক আর আক্রোশ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তাতেও হানাদারদের বিন্দুমাত্র ক্ষোভ কমে না।কমে না নির্যাতন।
গাড়ি থেকে নামিয়ে সেই তেজোদীপ্ত সূর্যসন্তানকে উন্মুক্ত স্থানে গাছের সাথে পা উল্টো করে ঝুলিয়ে নিচে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। পৈশাচিক কায়দায় চিৎকার করে বলে শূয়োর- ক্যা- বাচ্চা!বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ!আগুনের তাপ আর ধোঁয়া ক্রমশ বাড়তে থাকে। শ্বাসরোধ হয়ে আসে।মাথার মগজ গলার ভয়ঙ্কর জাহান্নাম সামনে দেখেও দেশপ্রেমিক যোদ্ধার মুখ দিয়ে শব্দ বেরোয়নি।বহু লালসার 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ'এই প্রার্থিত ধ্বনি শুনতে না পেয়ে ভয়ঙ্কর লাল আগুনে নরপশুরা পুড়িয়ে মারে বাংলা মায়ের সাহসী সন্তানকে।পোড়া শরীরের গন্ধ আর গলিত ফোঁটা ফোঁটা রক্তমাংসের তরলে ভাসে শহর,ভাসে জাতি,ভাসে দেশ। বাংলার মাটিতে নিরবে রয়ে যায় এক সাহসী রক্তগোলাপ, থেকে যায় পূতচিহ্ণ ! মুহূর্তের!অপযুগের! অনন্তকালের!