গন্তব্যহীন গন্তব্য

Sep 17, 2026 - 20:40
Sep 16, 2026 - 14:11
 0  0
গন্তব্যহীন গন্তব্য
ছবি এডিটঃ সম্পা রানী সরকার

রুপু অনার্স ফাইনাল ইয়ারে। ছাত্রী হোস্টেলে থাকে।দোতালার এক দখিন জানালার পাশে তার বেড।রাতের চাঁদটি পুরো বিছানায় পড়ে।সে আলোর ঢল মনকে ভাবায়,নাচায় ।রুপু আজলা ভরে সে জোছনাজল পান করে,স্নান করে।স্নিগ্ধ আর পবিত্র হয়ে উঠে তার বাবার মত, মায়ের মতো, পূর্বপুরুষের মত। যারা দলবেঁধে এই আলোর বানে এক হতো। সুখে হাসতো।পরের কষ্ট বুকে নিতো।কিচ্ছা শুনতো ।গীত গাইত। পুঁথি পাঠে সুর তুলতো। ধর্ম চর্চা করতো। প্রতিবেশীর নিরাপত্তা ঢাল হতো।সে সময় পিছনে ফেলে আজ রুপু উদ্ভিদবিদ্যার নিউক্লিয়াসে DNA এর জটিল রহস্যে বিভোর। তবু রাতের চাঁদ তাকে উন্মনা করে।টিএনটি ছাড়াও কথা বলার জন্য মোবাইল ফোন সবেমাত্র দুএকজনের হাতে এসেছে।হলে কারো কারো হাতে ছিল।রুপু বাবার কাছ থেকে  সাদাকালো মনিটরের একটি নকিয়া মোবাইল কিনে নেয়।তখন উৎসুক রুপু ও রুমমেটরা মিলে নাম্বার বানিয়ে মিস কল দেয়। এভাবে প্রায় মজা করে।একদিন এক পুরুষ কণ্ঠ হ্যালো আমি ধ্রুব বলছি। আপনি মিসকল দিয়েছেন।মিসকল!যে অদেখা তাকে মিস! আপনি কে?রুপুর উত্তর আমি মানবী। ধ্রুব বলে দানবী বা মানবী যেই হোন আপনার নাম কি?পরিচয়? অপরিচয়ের পথে ধ্রুব-রুপুর প্রচুর কথা হয়।সে কথা শুরু হয়ে রাত শেষ হয়। চাঁদ মুছে যায় তবু কথা চলতে থাকে। ধ্রুব বলে তুমি লাবণ্য না অমৃতা? ওদের মতো দিগন্তে হারাবে না তো?আমি মির্চা বা অমিত হতে পারবো না। ছায়াপথে অশরীরী দেখা হবার অপেক্ষায় যুগ পার করবো না।আমি মাটির মানবীকে সাথে চাই, পাশে চাই।কথার অমৃত, চাঁদের সুধায় এক হয়ে রুপু গান গায়,ধ্রুব ফোনের ওপাশ থেকে ধরে 'চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো '।আজ তাদের কাছে চরম সত্য এই মুঠোফোন।

‎Plant pathology বাদ দিয়ে রুপুর  এই মগ্নতা ,হল ছেড়ে ডিপার্টমেন্টের বন্ধু, শিক্ষকদের নজরে পড়ে।যে মেয়ে ফার্স্টক্লাস পাবে তার সাধারণ রেজাল্ট বাবা-মার মনে সংশয় জাগায়।মা ফোন কেড়ে নেয়।যে সম্পর্ক মনের সাথে মনের।যে সম্পর্ক আত্মিক তা ছেঁড়ার সাধ্য কার? ধ্রুব আর একটা ফোন পাঠায়। সিটিসেল।মা জানতে পেরে বাড়ি নিয়ে আটকে দেয়।এ যে সমাজ বিরুদ্ধ।তার অস্তিত্বে পারিপার্শ্বিক সংস্কার,বাবার আদর্শ।একদিন মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষায় মা সাথে এনে ডিপার্টমেন্টের বাইরে বসে থাকে।শেষ পরীক্ষায় রুপু ধ্রুবকে আসতে বলে। ক্যাম্পাসে বটমূলে সাদা শার্ট,কালো জিন্সে দাঁড়িয়ে ধ্রুব। সুদর্শন ।একজন কালো বোরখা পড়া মেয়ে এগিয়ে আসে। মুখ আবৃত। দেখতে সুশ্রী নয়।ধীর কণ্ঠে বলে তুমি ধ্রুব?আমি রুপু। আমাকে সাথে নিবে?আমি দেখতে ভালো না। ধ্রুব এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে রুপুর হাত ধরে বলে চল।তোমার মনের সৌন্দর্যে আমার মন মাতাল। বাহ্যিক চেহারা কি সম্পর্কের শর্ত? তোমার -আমার সম্পর্ক তো না দেখে,মন ছুঁয়ে, শরীরের ঊর্ধ্বে ।সেটি ঠুনকো?কাউন্টারে ধ্রুব টিকিট নিতে যায়। অনেক মানুষ।ওয়াশরুম গিয়ে রুপু বোরখা খুলে ফেলে।বাইরে যাত্রীদের সাথে বসে থাকে রুপু। ধ্রুব তাকে খুঁজে পায় না।সে ভাবে তাকে রুপুর পছন্দ হয়নি, কিংবা এতবড় চ্যালেঞ্জের ভয়ে চলে গেছে।দূরগামী বাসটি ছেড়ে দেয়। যাত্রীরা সবাই উঠে পড়ে। ধ্রুব বিষণ্ন মনে জানালার দিকে তাকিয়ে। পাশে শুন্য সিটে এক সুন্দরী, স্মার্ট মেয়ে বসলে ধ্রুব অস্বস্তি নিয়ে বলে সরি,এই দু'টো সিট আমার। সুন্দরী একটু হেসে বলে হ্যালো মিস্টার,এই সিটটি আমার। বান্ধবীর বোরখা পড়ে পালিয়ে এসেছি। ফেরার পথ নেই।হতভম্বের মতো তাকিয়ে ধ্রুব বলে রুপু!রুপু !চোখের কোণে একফোঁটা ভারী অশ্রু।রুপু হেসে বলে আমি দানবী।বাসটি চলতে থাকে চেনা বলয় ছেড়ে অজান দূরে.. ।তখন বোটানি ডিপার্টমেন্টের সামনে মেয়ের অপেক্ষায় মায়ের করুণ বিলাপ। সন্ধ্যার আজানের সুরে সেই বিলাপে মিশে চারপাশ আরো ভারি হয়...। 

‎রাতের চাঁদনী আর চলন্ত বাসের দুলুনি অযথা রুপুকে নিয়ে যায় সেই পবিত্র চাঁদের আলোর দেশে । বাবার মুখ... মায়ের মুখ..দাদা-দাদীর মুখ... অসংখ্য মুখ...যে আলোর ব্রতে কাটে আঁধার...সে আলোয়  আজ রুপু আঁধারের পথে হাঁটছে না? সংস্কার ভেঙে নিজেই নিয়ম গড়ছে?এটা অন্যায়? ভালোবাসা পাপ?...হেলপারের গম্ভীর কণ্ঠে সচেতন হয় রুপু।সামনে এক্সিডেন্ট হয়েছে।রাস্তা ক্লিয়ার হতে সময় লাগবে।

‎তখনও রুপুর হাতটি শক্ত করে ধরে ধ্রুব..